News:

ইতিহাস

১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে বুড়িহাটি গ্রামের যুবসমাজ উপলব্ধি করে যে খেলাধুলার পাশাপাশি শিক্ষার জন্য একটি স্থায়ী ও সংগঠিত প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন। এই চিন্তা থেকেই ১৫ নভেম্বর ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে বুড়িহাটি সম্রাট আনসার ও ভিডিপি ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়। ক্লাবটি খেলাধুলা, সমাজসেবা ও শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বুড়িহাটি উচ্চ বিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়। এটি বুড়িহাটি গ্রামের মানুষের শ্রম, ঐক্য ও শিক্ষানুরাগের প্রতীক। বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার গল্পে প্রকাশ পেয়েছে গ্রামবাসীর শিক্ষা ও সমাজ উন্নয়নের প্রতি গভীর আগ্রহ।

১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে বুড়িহাটির তরুণরা ফসলি জমিতে ফুটবল খেলত, কারণ এলাকায় কোনো উপযুক্ত খেলার মাঠ ছিল না। তখন গ্রামের যুবসমাজ উপলব্ধি করে যে শুধুমাত্র খেলাধুলা নয়, শিক্ষার জন্যও একটি সংগঠিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন।

এই চিন্তা থেকেই ১৫ নভেম্বর ১৯৮৯ সালে বুড়িহাটি সম্রাট আনসার ও ভিডিপি ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল গ্রাম যুবকদের ঐক্যবদ্ধ করা এবং খেলাধুলা, সমাজসেবা ও শিক্ষার প্রসার ঘটানো। তারা ছোট ছোট উদ্যোগে কাজ শুরু করে অর্থ সংগ্রহ, দরিদ্র পরিবারকে সাহায্য, বিবাহে সহায়তা এবং জাতীয় দিবস উদযাপন ইত্যাদি। ধীরে ধীরে তারা বুঝতে পারে যে গ্রামের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি স্থায়ী বিদ্যালয় এবং সেখান থেকেই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন জন্ম নেয়।

১৯৯৭ সালে ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, সহকারী শিক্ষক মোঃ শামসুল আলম এবং অন্যান্য সদস্যদের উদ্যোগে গ্রামের কেন্দ্রে একটি জমি ক্রয় করা হয় যা পরবর্তীতে বিদ্যালয়ের স্থায়ী স্থান হিসেবে নির্ধারিত হয়। ক্লাবের সহায়তা ও প্রবীণদের উৎসাহে বিদ্যালয় নির্মাণ শুরু হয়। ভূমি ভরাট, ভবনের ভিত্তি স্থাপন ও প্রথম শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ সবকিছুই সম্পন্ন হয় গ্রামবাসীর ঐক্যবদ্ধ পরিশ্রমে।

বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অনেক সম্মানিত ব্যক্তির অবদান রয়েছে। তাঁদের মধ্যে মোবারক হোসেন (সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান) এবং একাব্বর হোসেন (সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও সংসদ প্রার্থী) উল্লেখযোগ্য যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন ফলে নির্মাণকাজ দ্রুত সম্পন্ন হয়।

২০০১ সালে বিদ্যালয় উদ্বোধনের দিনটি ছিল গ্রামের জন্য এক ঐতিহাসিক ও আনন্দময় দিন। অনুষ্ঠানে গ্রামের প্রবীণ, শিক্ষক, স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এবং আশপাশের বিদ্যালয়ের প্রায় ৮ থেকে ১০ জন প্রধান শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। সেই দিন থেকেই বিদ্যালয়টি শুধু শিক্ষার নয়, সংস্কৃতি ও সামাজিক ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিদ্যালয়টি ধারাবাহিকভাবে শিক্ষার মানোন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের নাম, ছবি ও বিস্তারিত তথ্য প্রধান শিক্ষকের দপ্তরে সংরক্ষিত আছে যা শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীদের ত্যাগ ও ঐক্যের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।

আজ বুড়িহাটি উচ্চ বিদ্যালয় দৃঢ় সংকল্প, ঐক্য ও পরিশ্রমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিদ্যালয়টি শিক্ষা বিস্তারে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে এবং গ্রামের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।


বিদ্যালয়ের ইতিহাস - ২


১৯৮৯ সালের ১৫ নভেম্বর বুড়িহাটি সম্রাট আনসার ভিডিপি ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আজ আমরা গর্বের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছি মহান ঐতিহাসিক বুড়িহাটি উচ্চ বিদ্যালয়কে ঘিরে, যা আমাদের গ্রামের অহংকার ও গর্বের প্রতীক।

এই ক্লাব প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে একটি সুন্দর গল্প। সে সময়ে গ্রামে কোনো খেলার মাঠ ছিল না। ছেলে মেয়েরা কৃষিজমিতেই খেলাধুলা করত। ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৮ সালের মধ্যে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে গ্রামের পূর্বপাড়া ও পশ্চিমপাড়ার মধ্যে একসময় বিরোধ সৃষ্টি হয়। পশ্চিমপাড়ার কিছু তরুণ ছানোয়ার, কামরুজ্জামান, জিয়ারত প্রমুখ তাদের বড় ভাইদের কাছে বিষয়টি জানায়। বড় ভাইদের মধ্যে ছিলেন আমজাদ, মান্নানসহ আরও অনেকে।

এরপর ১৯৮৯ সালের ১৫ নভেম্বর বুধবার প্রত্যেকে ৫ টাকা করে চাঁদা দিয়ে ক্লাব গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। মোট সদস্য সংখ্যা হয় প্রায় ৩৪ জন। এভাবে টানা তিন বছর ধরে নিয়মিত চাঁদা সংগ্রহ করা হয়। সংগৃহীত অর্থ গ্রামের কিছু মানুষের কাছে ঋণ হিসেবে দেওয়া হতো এবং পরে তা পুনরায় আদায় করে পুনর্বিতরণ করা হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্লাবের তহবিলে যথেষ্ট অর্থ জমা হয়। তখন সদস্যরা আশঙ্কা করেন যে এই অর্থ কোনোভাবে অপব্যবহার বা আত্মসাৎ হয়ে যেতে পারে।

১৯৯৪ সালের দিকে বিভিন্ন জাতীয় দিবসে যেমন ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বর খেলাধুলা ও নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন শুরু হয়। বিশেষ করে ২৬ মার্চ দিনটি ক্লাবের পক্ষ থেকে জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপন করা হতো। বর্ষাকালে সদস্যরা নৌভ্রমণেও যেতেন। পাশাপাশি সামাজিক কাজও করা হতো, যেমন অসহায় মেয়েদের বিয়েতে আর্থিক সহায়তা প্রদান।

ক্রমে ক্লাবের নাম শুধু বুড়িহাটি নয়, আশপাশের গ্রামগুলোতেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তবে সদস্যদের মনে তখনও একটি অভাব রয়ে গিয়েছিল, তা হলো নিজস্ব খেলার মাঠের অভাব।

এ সময়ে আমি মুহাম্মদ শামছুল আলম বি এ পাস করি এবং জনাব মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বি এস সি পাস করেন। আমরা দুজনই ভাবলাম, লক্ষাধিক টাকা ব্যয় করে ব্যক্তিগতভাবে চাকরি নেওয়ার চেয়ে গ্রামের উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কিছু করা অনেক বেশি মূল্যবান। তাই আমজাদ, মান্নানসহ ক্লাবের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রস্তাব দিই, একটুখানি জমি কিনে নেওয়া যায় কি না। আমরা দুজনে মিলে গ্রামে পড়ানো শুরু করি, যেন তা গ্রামের কল্যাণ ও উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করা যায়।

ক্লাবে প্রতি মাসে চারটি সভা অনুষ্ঠিত হতো। জমি ক্রয় নিয়ে প্রায় প্রতিটি সভায় আলোচনা চলত। কেউ কেউ মত পরিবর্তন করলেও শেষ পর্যন্ত সবাই একমত হন। আমাদের পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর আমি আব্দুল মান্নান ও মোহাম্মদ আমজাদ হোসেনসহ অন্য সদস্যদের সঙ্গে জোরালোভাবে বিষয়টি উত্থাপন করি। অবশেষে ১৯৯৭ সালে গ্রামের মাঝামাঝি স্থানে জমি কেনা হয়।

জমি কেনার পরপরই একটি বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তা হলো সারা গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগের উদ্যোগ। ১৯৯৭ সালেই ক্লাবের উদ্যোগে প্রায় ১৩০টি মিটার ও ৪২টি খুঁটি বসানো হয়, যার আনুমানিক সরকারি ব্যয় ছিল ১৮ লক্ষ টাকা।

প্রথমে ওই জমিতে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়। জমি কেনার এক সপ্তাহ পর আমি আয়েন উদ্দিন স্যার (গ্রাম দুল্যা বেগম) এর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলি। তিনি বলেন,
“তোমরা যদি কাগজপত্র, যাতায়াত ও অফিস খরচ বহন করো, তাহলে আমি কাজটা সম্পন্ন করব।”

পরবর্তীতে তিনি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সম্পন্ন করেন এবং দীর্ঘদিন সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

প্রায় আড়াই বছর পর মাঠের উত্তর পাশে নিচু জায়গাটি মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়। ২০০০ সালের মাঝামাঝি সময়ে গ্রামের প্রবীণ মুরুব্বি মোজাফর উদ্দিন, দুঃখী মিয়া, আবেদ আলী, জহির উদ্দিন, এবাদত আলী, নুরুল ইসলামসহ ক্লাবের সকল সদস্য একত্র হয়ে সভা করে বিদ্যালয়ের ঘর নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন।

এই উদ্যোগে স্থানীয়ভাবে সহযোগিতা করেন জনাব মোবারক হোসেন সিদ্দিকী (ইউপি চেয়ারম্যান) এবং জনাব একাব্বর হোসেন (সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও এমপি প্রার্থী)। বিশেষ করে একাব্বর হোসেন প্রায় দুই লক্ষ টাকা অর্থসহায়তা করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

এরপর বিদ্যালয়ের ভবন নির্মিত হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গ্রামের মুরুব্বি, শিক্ষক সমিতির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং আট থেকে দশজন প্রধান শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন।

সবার অবগতির জন্য বলা দরকার, “সম্রাট আনসার ভিডিপি ক্লাব”-এর ৩৪ জন সদস্যের নাম, তাঁদের পিতার নাম ও ছবি বর্তমানে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কক্ষে সংরক্ষিত রয়েছে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই সেই সময়ের সকল গ্রামের প্রবীণ ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের, যাঁদের আন্তরিক উৎসাহ, সহযোগিতা ও প্রেরণা আমাদের এই মহান উদ্যোগকে সফল করেছে।

আমাদের একটাই কামনা, এই প্রতিষ্ঠানটি যেন আরও সুন্দর, সমৃদ্ধ ও সফলভাবে পরিচালিত হয়।

পরিশেষে বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক, কর্মচারী, সভাপতি ও সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলতে চাই, বুড়িহাটি সম্রাট আনসার ভিডিপি ক্লাবের প্রতিটি সদস্যই গ্রাম উন্নয়ন ও শিক্ষা বিস্তারের একেকজন নিরলস যোদ্ধা।

-শামছুল আলম
  সহকারী শিক্ষক এবং প্রতিষ্ঠাতা সদস্য
  বুড়িহাটি উচ্চ বিদ্যালয়